লিখেছেন: হাফিজুল ইসলাম লস্কর
মানুষ ভুলের ঊর্ধ্বে নয়। চলার পথে প্রলোভনের ফাঁদে পড়ে মানুষ বারবার পাপ করে, আবার অনুতপ্ত হয়ে ফিরে আসে স্রষ্টার দরবারে। কিন্তু কখনো কখনো পাপের পুনরাবৃত্তি মানুষের মনে এই বিশ্বাসের জন্ম দেয় যে, হয়তো আর ক্ষমার কোনো পথ নেই। অথচ মহান আল্লাহর দয়া ও রহমতের মহাসমুদ্র মানুষের সমস্ত পাপের চেয়েও বহুগুণ বিশাল। বিখ্যাত তাবেয়ী হযরত হাসান বসরি (রহ.) এবং আব্বাস নামের এক যুবকের জীবনের শেষ মুহূর্তের একটি ঘটনা আমাদের এই পরম সত্যেরই জানান দেয়।
যুগে যুগে আল্লাহ তা'আলা মানবজাতিকে আশার বাণী শুনিয়েছেন। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে:
"বলুন, হে আমার বান্দাগণ! যারা নিজেদের প্রতি অবিচার করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করে দেন। তিনি তো ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।" (সূরা আজ-জুমার, আয়াত: ৫৩)
আব্বাস নামের সেই যুবকটি দুর্বলচিত্তের কারণে সত্তর বারেরও বেশি তওবা ভেঙে আবার পাপে লিপ্ত হয়েছিল। আপাতদৃষ্টিতে তাকে একজন 'চরম পাপিষ্ঠ' মনে হলেও, তার অন্তরে আল্লাহর প্রতি ভয় এবং নিজের ভুলের প্রতি অনুশোচনা পুরোপুরি মরে যায়নি। মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে শায়খ হাসান বসরি যখন তাকে শিক্ষা দেওয়ার উদ্দেশ্যে কঠোরতা দেখালেন, তখন যুবকটি মানুষের ওপর ভরসা ছেড়ে সরাসরি আরশের মালিকের কাছে নিজেকে সঁপে দিল।
মৃত্যুশয্যায় আব্বাস তার মাকে অসিয়ত করেছিল যে, মরদেহের গলায় রশি বেঁধে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাওয়ার। তা ছিল নিজের অহংকার ও নফসকে চূর্ণ করার এক চরম বহিঃপ্রকাশ। নিজের পাপের প্রতি তার ঘৃণা এতটাই তীব্র ছিল যে, সে দুনিয়ার সমস্ত অপমান মেনে নিতে প্রস্তুত ছিল, কেবল আল্লাহর দয়া পাওয়ার আশায়।
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "অনুতপ্ত হওয়াই হলো তওবা।" (ইবনে মাজাহ)। আব্বাসের এই চরম আকুলতা ও খাঁটি অনুশোচনাই আল্লাহর দরবারে কবুল হয়ে গিয়েছিল। ফলে দুনিয়ার মানুষ তাকে ফিরিয়ে দিলেও, আরশের মালিক তাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিয়ে নিজের রহমতের চাদরে জড়িয়ে নিলেন।
পাপ যত বড় বা যত বেশিই হোক না কেন, আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়া যাবে না। শয়তানের সবচেয়ে বড় অস্ত্র হলো মানুষকে আল্লাহর দয়া থেকে নিরাশ করা।
কাউকে বিচার করার অধিকার আমাদের নেই, কোনো পাপীর বাহ্যিক অবস্থা দেখে তার পরকাল নিয়ে চূড়ান্ত মন্তব্য করার অধিকার কোনো মানুষের নেই। হযরত হাসান বসরি (রহ.)-এর মতো মহান বুজুর্গকেও আল্লাহ স্বপ্নে সতর্ক করেছিলেন, যেন আল্লাহর কোনো বান্দাকে তাঁর রহমত থেকে নিরাশ করা না হয়।
নিঃশ্বাস বন্ধ হওয়ার আগ পর্যন্ত তওবার দরজা উন্মুক্ত। বারবার তওবা ভাঙা অবশ্যই অন্যায়, কিন্তু তওবা করা ছেড়ে দেওয়া তার চেয়েও বড় বিপর্যয়।
আল্লাহর ইজ্জতের কসম খেয়ে দেওয়া সেই ঐশী বাণী আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সৃষ্টির প্রতি স্রষ্টার ভালোবাসা অসীম। আমরা যেন কখনো কোনো পাপিষ্ঠকে ঘৃণা না করি, বরং তাকে আলোর পথে ফেরার সুযোগ করে দিই। আর নিজেরা শতবার ভুল করলেও যেন বারবার মাথা নত করি সেই পরম দয়ালুর দরবারে, যিনি প্রতি রাতে ডেকে বলেন "কে আছ ক্ষমা প্রার্থনাকারী, যাকে আমি ক্ষমা করে দেব?"
আল্লাহ আমাদের সবাইকে খাঁটি তওবা নসিব করুন এবং তাঁর রহমতের ছায়াতলে আশ্রয় দিন। আমীন।