সুবর্ণ বিশ্বাস,
ঝিনাইদহ জেলা প্রতিনিধি:
বিচার চাওয়ার আকুতি যখন থানার বন্ধ দরজায় ধাক্কা খেয়ে ফিরে আসে, তখন রাজপথই হয়ে ওঠে শেষ সম্বল। নিথর স্বজনের দেহ সামনে রেখে থানার সামনে নয়, একেবারে শহরের প্রাণকেন্দ্রে নেমে এসেছে ক্ষুব্ধ জনতা। ঝিনাইদহে নিহত শিখার মর্মান্তিক মৃত্যুর পর থানায় মামলা গ্রহণ না করার চরম অভিযোগ তুলে, লাশ সামনে রেখেই পোস্ট অফিস মোড়ে গড়ে তোলা হয়েছে নজিরবিহীন ও অগ্নিগর্ভ প্রতিরোধ।
পুলিশের নিষ্ক্রিয়তায় ক্ষোভের আগুন, থমকে গেছে শহর
স্বজনদের বুকফাটা আর্তনাদ আর সাধারণ মানুষের তীব্র প্রতিবাদের গর্জনে থমকে যায় ঝিনাইদহ শহরের ব্যস্ততম পোস্ট অফিস মোড়। শিখার স্বজনদের অভিযোগ, প্রিয়জনকে হারানোর বেদনায় যখন তারা বিচার চাইতে থানায় গিয়েছিলেন, তখন পুলিশ আইনি সহায়তা দেওয়া তো দূরের কথা, মামলা গ্রহণ করতেই অস্বীকৃতি জানায়। অভিযোগ ফিরিয়ে দেওয়ার এই ঘটনায় চরম ক্ষোভ ও অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে পুরো এলাকায়।
আইনের রক্ষক হিসেবে পরিচিতদের এমন দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণে ক্ষুব্ধ হয়ে নিহতের পরিবার ও এলাকাবাসী বাধ্য হয়েই শিখার মৃতদেহ রাজপথে এনে এই অভূতপূর্ব মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করে।
'আগে মামলা, তারপর লাশ দাফন': স্বজনদের হুংকার
মানববন্ধনে বক্তব্য রাখার সময় শিখার পরিবারের সদস্যরা কান্নায় ভেঙে পড়েন, কিন্তু তাঁদের চোখে-মুখে ফুটে ওঠে চরম প্রতিবাদের ছাপ। স্বজনরা স্পষ্ট ভাষায় হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন—
"আমাদের স্বজনকে হত্যা বা অকালমৃত্যুর মুখোমুখি করা হয়েছে, আর থানা আমাদের মামলা পর্যন্ত নিচ্ছে না! আমরা কি এই দেশে বিচার পাওয়ার যোগ্য নই? যতক্ষণ পর্যন্ত থানায় মামলা দায়ের করা না হবে এবং অপরাধীদের গ্রেফতারের সুস্পষ্ট আশ্বাস না পাব, ততক্ষণ আমাদের লড়াই থামবে না।"
ঝিনাইদহের সচেতন নাগরিক ও স্থানীয় জনতাও এই মানববন্ধনে একাত্মতা প্রকাশ করেন। বক্তারা বলেন, একজন নাগরিকের থানায় গিয়ে মামলা করার মৌলিক অধিকার রয়েছে। পুলিশ যখন অপরাধীদের আড়াল করতে বা অজ্ঞাত কারণে মামলা নিতে গড়িমসি করে, তখন তা বিচারহীনতার সংস্কৃতিকে উসকে দেয়।
রাজপথ থেকে উত্থাপিত ৩ দফা দাবি
মানববন্ধন থেকে নিহতের পরিবার ও বিক্ষুব্ধ জনতা প্রশাসনকে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য নিম্নলিখিত দাবিগুলো পেশ করেন:
অনতিবিলম্বে মামলা গ্রহণ: নিহত শিখার পরিবার যে এজাহার থানায় জমা দিতে চেয়েছে, তা অবিলম্বে আনুষ্ঠানিকভাবে মামলা (এফআইআর) হিসেবে নথিভুক্ত করতে হবে।
পক্ষপাতহীন তদন্ত ও গ্রেফতার: কোনো অজুহাত বা প্রভাবশালী মহলের চাপ ছাড়াই ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত চালিয়ে মূল অপরাধীদের দ্রুততম সময়ে গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
দায়িত্বে অবহেলার বিচার: স্বজনদের ফিরিয়ে দেওয়া এবং মামলা না নেওয়ার পেছনে জড়িত দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ও আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে।
কঠোর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি
মানববন্ধনের শেষভাগে নিহতের স্বজন ও আন্দোলনকারীরা স্পষ্ট জানিয়ে দেন, ঝিনাইদহে এই বিচারহীনতার অপচেষ্টা সফল হতে দেওয়া হবে না। যদি দ্রুততম সময়ের মধ্যে মামলা গ্রহণ করে অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা না হয়, তবে পোস্ট অফিস মোড় থেকে শুরু হওয়া এই স্ফুলিঙ্গ পুরো জেলায় রাজপথ অবরোধসহ আরও কঠোর ও সর্বাত্মক আন্দোলনে রূপ নেবে।